Monday, October 24, 2022

মেঘের দিন

 ঘুম ভাঙে জানলার কাচে বৃষ্টির ছাটের শব্দে। বৃষ্টি দেখে ঘুম আরও গাঢ় হলো। ঘুম ভেঙে জালনা খোলে বসে আছি কখন থামবে বা কমবে বৃষ্টি৷ থামার আর নাম নেই। এক সময় সময় যখন খুব টাইট তখন বের হই৷ রাস্তায় জনমানবহীন অনেকটা। যেন আজ কারও কাজ নেই। যাদের আছে তারা সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাচ্ছে স্বল্প চলা রিকশাগুলোর দিকে৷ আমি মাথায় ব্যাগ দিয়ে অল্প একটু হেঁটেই পুরো কাকভেজা অবস্থা। তখন একটা থরথর করে কেঁপে রিকশা চালিয়ে একজন বৃদ্ধ আসছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম কাটাবন যাবেন। উনি রেগুলার ভাড়া থেকে ১০ টাকা বেশি চাইলেন। আমি রীতিমতো অবাক। এমন থমথম গমগম আবহাওয়ায় ওনার চাহিদা এত কম। আমি বললাম চলেন অসুবিধা নাই৷ আমি তখনও পর্যন্ত জানি না যে আজকে এই ভয়াবহ অবস্থার কারণ কী! আমার কাছে ফাঁকা ঢাকায় রিকশা ভ্রমণ ভালোই লাগছিল। হঠাৎ এই ভালো লাগা থেমে গেল একটা পোস্ট দেখে যে, যারা এই বৃষ্টি দেখে খুশি হচ্ছেন তারা নাকি মানুষের বাচ্চা না। কারণ সিত্রাংয়ের ঝুঁকিতে আছে উপকূলবাসী৷ 


কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গেই কুতর্ক করলাম। যে অন্যের দুঃখে আমরা দুঃখী হওয়ার যতটা ভং ধরি সত্যিই কি অতটুক দুঃখী হওয়া সম্ভব। কিংবা সম্ভব হলেও এটা সহজাত নাকি রপ্ত করা অন্যেরটা দেখে। যে এই এই ব্যাপারে আমাদের এমন করতে হবে? 


এও ভাবলাম যে, পৃথিবীতে প্রতিদিন নানান দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। খুন খারাবি হচ্ছে। ওগুলোর জন্য কী আমরা স্বাভাবিক কার্যক্রম বাদ রাখি। তাহলে এখন কেন আমাদের এই যতটুক পারা যায় আনন্দ করলে অপরাধ কেন হয়ে যাবে! 


কিন্তু সব দুনামুনার অবসান ঘটালাম একটু সরল হয়ে যে, একই দেশের মানুষ, তাদের বিপদের সময় আমাদের একটু সহানুভূতিশীল আচরণ তো করতেই পারি। আনন্দ নাই বলেই না হুদাই নানান আনন্দ দেখাই। এই সময়গুলোতে নরমাল আচরণ ভালো।

Tuesday, November 2, 2021

পনেরো বছর পরের একদিন অথবা একটি চাঁদের অমাবস্যা

 

  

আমার নাম শুভ। শুভ' আভিধানিক অর্থ ভালো। অথচ আমার ক্ষেত্রে তা শুধু অভিধানেই সীমাবদ্ধ। আমার নামেরবাস্তব প্রয়োগ আমি কোথাও দেখাতে পারি নি। আমার জীবনে কোনো ভালো কিছুর ছাপ নেই। ভালো ব্যবহারভালো বন্ধুকিছুই নেই আমার। অন্ধকারই আমার একমাত্র জীবন।  মানুষ হিসেবে ঘরকুনো হলেও যখন বের হই তখন খারাপ কাজছাড়া কিছু করি না। করতে ইচ্ছেই হয় না। নামেএ বিপরীতে যাওয়ারই প্ল্যান আমার সব সময়। রাস্তারপাশে ঘরহীনমানবেতর জীবন যাপনকারী অসহায় মানুষ থেকে শুরু করে ভার্সিটির শিক্ষক সবার সাথেই যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাই যেনআমার এই পৃথিবীতে একমাত্র কাজ। ভালো কোনোকিছুর ধার ধারি না। রিকশা ভাড়া দর কষাকষি করে ওঠার পরওতর্কাতর্কি করি ভাড়া মেটানোর সময়একপর্যায়ে ঘুষি কিংবা  গালিগালাজ করে ক্ষান্ত হই। 


ভালো যেকোনো কিছুতেই যেন আমার  প্রচন্ড এলার্জি। ভীষণরকম চুলকায়। আমার কাছে ভালো সবকিছুই কাঁদামাটিরগড়া শিশুর খেলনা মাত্র। যা খেলার একপর্যায়ে ভেঙে ফেলাই নিয়ম। তাই আমি ভালোমানুষিকে দেখি সুযোগের অভাবেভালো থাকার অভিনয় হিসেবে। 


আমার এইসব অস্বাভাবিক আচরণের জন্য আমার জন্মকে দায়ী ভাবতে থাকি। 

কেননা আমার জন্ম হয় আমার মায়ের মৃত্যুর দুইদিন পর। কথাটা শুনেই মনে হতে পারে নেশাগ্রস্থ বেড়ালের আপ্ত বাক্য।কিংবা কোনো ফালতু গল্পের একটা মনোযোগ আকর্ষণ করা পাঞ্চ লাইন। আরে বলে কী পড়ে দেখি এমন। আসলে ওতকিছু না ব্যাপারটা।  বা 'হাউ ইজ ইট পসিবলবলে  ভ্যাবাচেকা খাওয়ার মতো বিষয়ও না। অবশ্য আমিও প্রথম প্রথম এইঘটনা বা গল্প শোনে  অবাক হওয়ার শেষ পর্যায়ে গিয়ে বসে থাকতাম। কিংবা এমন ভাব করতাম যেন , এটা আমি ছাড়াপৃথিবীর আর কারও সাথে ঘটেনি।

ঘটনাটা খুবই সিম্পল আর সস্তা গল্প হিসেবে ইন্টারেস্টিং  


আমার মা আমাকে প্রসব করে সেন্সলেস হয়ে পড়ে। হওয়ারই কথা। আমার মায়ের বয়স তো তখন সবে ১৫। পনেরোবছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কি না আবার একটা ৯মাস পেটে রেখে অথবা বলা যায় ৯মাস বয়সী এক বাচ্চা প্রসব করেফেলেছে। জ্ঞান ফিরেও পেয়েছিলেন দ্রুতই। কিন্তু আরেক অঘটন জানতে পেরে আবার সেন্সলেস হওয়া লাগছে আমারমায়ের। ডাক্তার আমাকে ঘোষণা করেছিলেন মৃত। মা কথাটা শুনেও ফেলে ওই অবস্থায়। না শোনানোর স্কোপও ছিল না।ফিনকি দিয়ে মায়ের বুক থেকে দুধ বের হচ্ছিল। আমাকে ছাড়া সে বেদনাময় দুধ কে থামাতে পারে তখনঅথচ আমিনাকি মৃতকোনো সাড়াশব্দ নেইনড়নচড়ন নেই। যেন আমি খুব অবাক হয়ে গেছি। বিরক্ত হয়ে  মেরে চুপটি হয়েআছি। আমি নাহয় চুপ রয়েছিলাম। আমার শ্বাস প্রশ্বাস , শিরা-উপশিরাগুলো যে কেন  হয়ে ছিলসেই এক দুঃখেরইতিহাস। মায়ের কান্না মে বি শুনেও আমি চুপ রয়েছিলাম এখনকার যে খারাপ মানুষ আমি সেরকমভাবেই।  সব আশাজলাঞ্জলি দিয়ে আমার মা তখন নেয় এক সাহসী কিন্তু 'বোকাবোকাসিদ্ধান্ত। কোনোদিনও আর না জাগার সিদ্ধান্ত নেয়।ওই কাঁচা অসুস্থ শরীরে নাকি মা আমার নৃশংস আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। কীভাবে সে আত্মত্যা করেছিলেন সেটা আমিএখনো জানি না। তাও ঘটনাটা ঘটায় ৪৮ ঘণ্টা আমাকে অযথা বুকে চেপে রেখে। তারপর নাকি তিনি আমাকে ছেড়ে দেয়আর ছেড়ে দেন জীবনকেও। 

আর অলৌকিকভাবে অসভ্যের মতো একটা কান্না দিয়ে হাসপাতাল মাথায় তুলি। 


 মারা যাওয়ার আগে নাকি বারবার শুধু বলতেন আমার শুভ মরেনি ডাক্তার ভুল বলেছে। আমার নাম আমার জন্মেরআগেই মা দিয়েছিলো  অবশ্য। 

মায়ের হাত তখন বাবার হাতে শক্ত করে ধরা। বাবা তখন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল আর ভাবছিল মায়ের ভীমরতি। মা তখনবলে উঠে আমার ছেলেকে আমার কাছে নিয়ে আসো।


 ডাক্তার এবং আমার আত্মীয় স্বজন নিথর দেহের আমাকে প্রাণচঞ্চল দেখে ভীষণ অবাক হয়।

সবার ধারণা জন্মেছিল আমি মানুষ না অন্যকিছু। খুব বেশিদিন আমি টিকবো না। মিরাক্কেলভাবে যেমন আমার উদয়তেমনি মিরাক্কেলভাবে আমি অস্তমিত হবো শিগ্রই। ৪৮ ঘণ্টা পর যেহেতু আমি জেগে উঠি তাই আমি সহজ বাংলায় বলিমায়ের মৃত্যুর দুদিন পর আমার জন্ম।


আমার মায়ের আত্মাহুতির জন্য আমার দাদি মাকে সবসময় ভৎসর্না করে। বলেকপালপুড়ির দোযখেও জায়গা হবে না।

এমন ভৎসর্না শুনে আমার কষ্ট পাওয়ার কথা কিন্তু আমি কষ্ট পাই না। বরং চরম বিনোদিত হই। এর জন্য আমার কঠিনহৃদয়  দায়ী না। বরং মায়ের প্রতি অজানা ভালোবাসা থেকেই  আনন্দ পাই। দোযখে স্থান না হওয়াই তো ভালো।দোযখে শুনেছি অনেক কষ্টযদিও বুঝি কী হাস্যকর সহজ করে নিচ্ছি দাদির ভাষাকে। 

আমার মায়ের হঠাৎ  সিদ্ধান্ত দুনিয়ার কেউ মেনে না নিতে পারলেও আমি মেনে নিই অনায়াসেই। কারণ আমি মনে করিজন্ম বা মৃত্যু দুইটাই মানুষের ইচ্ছায় হওয়া উচিত। অচেনা অনিশ্চিত একটা পৃথিবীতে হঠাৎ কষ্টের জন্য কেন জন্ম নিবেমানুষ  কিংবা কেন বেঁচে থাকতে না চাইলেও মরতে পারবে না। 


আর তাছাড়া আত্মহত্যার অধিকার তার ছিলো। কেননা  ১৫ বছরের একটা কচি মেয়ে কখনো মেনে নিতে পারে না তারপ্রথম সন্তান মৃত। পারবে না লোকমুখে শুনতে সন্তানকখেকো মা।

মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু হলে মানুষের আই কীই বা থাকে। আকাশসম স্বপ্ন দেখা আমার মায়ের স্বপ্ন অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।আমার মৃত্যুর কথা শোনার মধ্য দিয়েই। মা কীভাবে জানি জেনে গেছিল তার সন্তান ছেলেই হবে। আর তাই জন্মেরআগেই ঘরভর্তি ছিল 'ছেলেদের খেলনায়  যদিও আমি কখনো ওগুলো দিয়ে খেলিনি। খেলাধুলার প্রতি বিরাগ আমারজন্মের পর থেকেই। 


কচি বয়সী মায়ের আরও নানান ছেলেমানুষি স্বপ্ন বুনেছিল। বাবাকে নাকি বলত , ছেলে যখন নির্ঘুম থাকবে তুমি আমিতিনজনেই সজাগ থাকব।  বাবা মুচকি মুচকি হাসতো মায়ের ছেলেমানুষিতে। অবাক স্বপ্নে। 

এত স্বপ্ন আর এত আদর যখন ব্যর্থ হয়ে যাই তখন বেঁচে থাকাটাই একটা মরে যাওয়া হয়ে দাঁড়ায়। তাই মায়েরআত্মহত্যাকে আমি সমর্থন করি।


সেই সাথে নিজেকে চরম দায়ী মনে করি - মায়ের মৃত্যুর জন্য। 

এনিয়ে হাজারও  যুক্তি দেখালে লাভ হবে না। যুক্তির বাইরে থেকে হোক আর যুক্তির ভেতর থেকেই হোক আমি আমারবিশ্বাসে স্থির। আই কিলড মাই মাদার। 


শুনেছি মায়ের মৃত্যুদিন আকাশে ছিল পূর্ণিমা তিথি। আর শ্রাবণের টিপটিপানি। বয়স ছিলো ১৫ বছর ১৫ দিন।আজকেও সেই একই দিনের একই বয়সে পৌঁছেছি আমি। মায়ের মৃত্যুর প্রায়শ্চিত্তের আশায় আজ আমি চিরতরে হারিয়েযাবো  গ্রহ থেকে। আমার হাতে হেমলক বিষ। শ্রাবণের মেঘলা আকাশে হবো নীলছায়া। চাঁদের জ্যোৎস্না গায়ে মেখেমায়ের হাত ধরে হাটবো বহুদূর। আর না বলা ডাকে পাগল করবো মাকে  কোনোদিনও আর কারও সাথে খারাপ ব্যবহারকরতে হবে না। পনেরো বছর পরের একদিন অথবা একটি চাঁদের অমাবস্যা 

  

আমার নাম শুভ। শুভ' আভিধানিক অর্থ ভালো। অথচ আমার ক্ষেত্রে তা শুধু অভিধানেই সীমাবদ্ধ। আমার নামেরবাস্তব প্রয়োগ আমি কোথাও দেখাতে পারি নি। আমার জীবনে কোনো ভালো কিছুর ছাপ নেই। ভালো ব্যবহারভালো বন্ধুকিছুই নেই আমার। অন্ধকারই আমার একমাত্র জীবন।  মানুষ হিসেবে ঘরকুনো হলেও যখন বের হই তখন খারাপ কাজছাড়া কিছু করি না। করতে ইচ্ছেই হয় না। নামেএ বিপরীতে যাওয়ারই প্ল্যান আমার সব সময়। রাস্তারপাশে ঘরহীনমানবেতর জীবন যাপনকারী অসহায় মানুষ থেকে শুরু করে ভার্সিটির শিক্ষক সবার সাথেই যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাই যেনআমার এই পৃথিবীতে একমাত্র কাজ। ভালো কোনোকিছুর ধার ধারি না। রিকশা ভাড়া দর কষাকষি করে ওঠার পরওতর্কাতর্কি করি ভাড়া মেটানোর সময়একপর্যায়ে ঘুষি কিংবা  গালিগালাজ করে ক্ষান্ত হই। 


ভালো যেকোনো কিছুতেই যেন আমার  প্রচন্ড এলার্জি। ভীষণরকম চুলকায়। আমার কাছে ভালো সবকিছুই কাঁদামাটিরগড়া শিশুর খেলনা মাত্র। যা খেলার একপর্যায়ে ভেঙে ফেলাই নিয়ম। তাই আমি ভালোমানুষিকে দেখি সুযোগের অভাবেভালো থাকার অভিনয় হিসেবে। 


আমার এইসব অস্বাভাবিক আচরণের জন্য আমার জন্মকে দায়ী ভাবতে থাকি। 

কেননা আমার জন্ম হয় আমার মায়ের মৃত্যুর দুইদিন পর। কথাটা শুনেই মনে হতে পারে নেশাগ্রস্থ বেড়ালের আপ্ত বাক্য।কিংবা কোনো ফালতু গল্পের একটা মনোযোগ আকর্ষণ করা পাঞ্চ লাইন। আরে বলে কী পড়ে দেখি এমন। আসলে ওতকিছু না ব্যাপারটা।  বা 'হাউ ইজ ইট পসিবলবলে  ভ্যাবাচেকা খাওয়ার মতো বিষয়ও না। অবশ্য আমিও প্রথম প্রথম এইঘটনা বা গল্প শোনে  অবাক হওয়ার শেষ পর্যায়ে গিয়ে বসে থাকতাম। কিংবা এমন ভাব করতাম যেন , এটা আমি ছাড়াপৃথিবীর আর কারও সাথে ঘটেনি।

ঘটনাটা খুবই সিম্পল আর সস্তা গল্প হিসেবে ইন্টারেস্টিং  


আমার মা আমাকে প্রসব করে সেন্সলেস হয়ে পড়ে। হওয়ারই কথা। আমার মায়ের বয়স তো তখন সবে ১৫। পনেরোবছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কি না আবার একটা ৯মাস পেটে রেখে অথবা বলা যায় ৯মাস বয়সী এক বাচ্চা প্রসব করেফেলেছে। জ্ঞান ফিরেও পেয়েছিলেন দ্রুতই। কিন্তু আরেক অঘটন জানতে পেরে আবার সেন্সলেস হওয়া লাগছে আমারমায়ের। ডাক্তার আমাকে ঘোষণা করেছিলেন মৃত। মা কথাটা শুনেও ফেলে ওই অবস্থায়। না শোনানোর স্কোপও ছিল না।ফিনকি দিয়ে মায়ের বুক থেকে দুধ বের হচ্ছিল। আমাকে ছাড়া সে বেদনাময় দুধ কে থামাতে পারে তখনঅথচ আমিনাকি মৃতকোনো সাড়াশব্দ নেইনড়নচড়ন নেই। যেন আমি খুব অবাক হয়ে গেছি। বিরক্ত হয়ে  মেরে চুপটি হয়েআছি। আমি নাহয় চুপ রয়েছিলাম। আমার শ্বাস প্রশ্বাস , শিরা-উপশিরাগুলো যে কেন  হয়ে ছিলসেই এক দুঃখেরইতিহাস। মায়ের কান্না মে বি শুনেও আমি চুপ রয়েছিলাম এখনকার যে খারাপ মানুষ আমি সেরকমভাবেই।  সব আশাজলাঞ্জলি দিয়ে আমার মা তখন নেয় এক সাহসী কিন্তু 'বোকাবোকাসিদ্ধান্ত। কোনোদিনও আর না জাগার সিদ্ধান্ত নেয়।ওই কাঁচা অসুস্থ শরীরে নাকি মা আমার নৃশংস আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। কীভাবে সে আত্মত্যা করেছিলেন সেটা আমিএখনো জানি না। তাও ঘটনাটা ঘটায় ৪৮ ঘণ্টা আমাকে অযথা বুকে চেপে রেখে। তারপর নাকি তিনি আমাকে ছেড়ে দেয়আর ছেড়ে দেন জীবনকেও। 

আর অলৌকিকভাবে অসভ্যের মতো একটা কান্না দিয়ে হাসপাতাল মাথায় তুলি। 


 মারা যাওয়ার আগে নাকি বারবার শুধু বলতেন আমার শুভ মরেনি ডাক্তার ভুল বলেছে। আমার নাম আমার জন্মেরআগেই মা দিয়েছিলো  অবশ্য। 

মায়ের হাত তখন বাবার হাতে শক্ত করে ধরা। বাবা তখন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল আর ভাবছিল মায়ের ভীমরতি। মা তখনবলে উঠে আমার ছেলেকে আমার কাছে নিয়ে আসো।


 ডাক্তার এবং আমার আত্মীয় স্বজন নিথর দেহের আমাকে প্রাণচঞ্চল দেখে ভীষণ অবাক হয়।

সবার ধারণা জন্মেছিল আমি মানুষ না অন্যকিছু। খুব বেশিদিন আমি টিকবো না। মিরাক্কেলভাবে যেমন আমার উদয়তেমনি মিরাক্কেলভাবে আমি অস্তমিত হবো শিগ্রই। ৪৮ ঘণ্টা পর যেহেতু আমি জেগে উঠি তাই আমি সহজ বাংলায় বলিমায়ের মৃত্যুর দুদিন পর আমার জন্ম।


আমার মায়ের আত্মাহুতির জন্য আমার দাদি মাকে সবসময় ভৎসর্না করে। বলেকপালপুড়ির দোযখেও জায়গা হবে না।

এমন ভৎসর্না শুনে আমার কষ্ট পাওয়ার কথা কিন্তু আমি কষ্ট পাই না। বরং চরম বিনোদিত হই। এর জন্য আমার কঠিনহৃদয়  দায়ী না। বরং মায়ের প্রতি অজানা ভালোবাসা থেকেই  আনন্দ পাই। দোযখে স্থান না হওয়াই তো ভালো।দোযখে শুনেছি অনেক কষ্টযদিও বুঝি কী হাস্যকর সহজ করে নিচ্ছি দাদির ভাষাকে। 

আমার মায়ের হঠাৎ  সিদ্ধান্ত দুনিয়ার কেউ মেনে না নিতে পারলেও আমি মেনে নিই অনায়াসেই। কারণ আমি মনে করিজন্ম বা মৃত্যু দুইটাই মানুষের ইচ্ছায় হওয়া উচিত। অচেনা অনিশ্চিত একটা পৃথিবীতে হঠাৎ কষ্টের জন্য কেন জন্ম নিবেমানুষ  কিংবা কেন বেঁচে থাকতে না চাইলেও মরতে পারবে না। 


আর তাছাড়া আত্মহত্যার অধিকার তার ছিলো। কেননা  ১৫ বছরের একটা কচি মেয়ে কখনো মেনে নিতে পারে না তারপ্রথম সন্তান মৃত। পারবে না লোকমুখে শুনতে সন্তানকখেকো মা।

মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু হলে মানুষের আই কীই বা থাকে। আকাশসম স্বপ্ন দেখা আমার মায়ের স্বপ্ন অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।আমার মৃত্যুর কথা শোনার মধ্য দিয়েই। মা কীভাবে জানি জেনে গেছিল তার সন্তান ছেলেই হবে। আর তাই জন্মেরআগেই ঘরভর্তি ছিল 'ছেলেদের খেলনায়  যদিও আমি কখনো ওগুলো দিয়ে খেলিনি। খেলাধুলার প্রতি বিরাগ আমারজন্মের পর থেকেই। 


কচি বয়সী মায়ের আরও নানান ছেলেমানুষি স্বপ্ন বুনেছিল। বাবাকে নাকি বলত , ছেলে যখন নির্ঘুম থাকবে তুমি আমিতিনজনেই সজাগ থাকব।  বাবা মুচকি মুচকি হাসতো মায়ের ছেলেমানুষিতে। অবাক স্বপ্নে। 

এত স্বপ্ন আর এত আদর যখন ব্যর্থ হয়ে যাই তখন বেঁচে থাকাটাই একটা মরে যাওয়া হয়ে দাঁড়ায়। তাই মায়েরআত্মহত্যাকে আমি সমর্থন করি।


সেই সাথে নিজেকে চরম দায়ী মনে করি - মায়ের মৃত্যুর জন্য। 

এনিয়ে হাজারও  যুক্তি দেখালে লাভ হবে না। যুক্তির বাইরে থেকে হোক আর যুক্তির ভেতর থেকেই হোক আমি আমারবিশ্বাসে স্থির। আই কিলড মাই মাদার। 


শুনেছি মায়ের মৃত্যুদিন আকাশে ছিল পূর্ণিমা তিথি। আর শ্রাবণের টিপটিপানি। বয়স ছিলো ১৫ বছর ১৫ দিন।আজকেও সেই একই দিনের একই বয়সে পৌঁছেছি আমি। মায়ের মৃত্যুর প্রায়শ্চিত্তের আশায় আজ আমি চিরতরে হারিয়েযাবো  গ্রহ থেকে। আমার হাতে হেমলক বিষ। শ্রাবণের মেঘলা আকাশে হবো নীলছায়া। চাঁদের জ্যোৎস্না গায়ে মেখেমায়ের হাত ধরে হাটবো বহুদূর। আর না বলা ডাকে পাগল করবো মাকে  কোনোদিনও আর কারও সাথে খারাপ ব্যবহারকরতে হবে না। পনেরো বছর পরের একদিন অথবা একটি চাঁদের অমাবস্যা 

  

আমার নাম শুভ। শুভ' আভিধানিক অর্থ ভালো। অথচ আমার ক্ষেত্রে তা শুধু অভিধানেই সীমাবদ্ধ। আমার নামেরবাস্তব প্রয়োগ আমি কোথাও দেখাতে পারি নি। আমার জীবনে কোনো ভালো কিছুর ছাপ নেই। ভালো ব্যবহারভালো বন্ধুকিছুই নেই আমার। অন্ধকারই আমার একমাত্র জীবন।  মানুষ হিসেবে ঘরকুনো হলেও যখন বের হই তখন খারাপ কাজছাড়া কিছু করি না। করতে ইচ্ছেই হয় না। নামেএ বিপরীতে যাওয়ারই প্ল্যান আমার সব সময়। রাস্তারপাশে ঘরহীনমানবেতর জীবন যাপনকারী অসহায় মানুষ থেকে শুরু করে ভার্সিটির শিক্ষক সবার সাথেই যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাই যেনআমার এই পৃথিবীতে একমাত্র কাজ। ভালো কোনোকিছুর ধার ধারি না। রিকশা ভাড়া দর কষাকষি করে ওঠার পরওতর্কাতর্কি করি ভাড়া মেটানোর সময়একপর্যায়ে ঘুষি কিংবা  গালিগালাজ করে ক্ষান্ত হই। 


ভালো যেকোনো কিছুতেই যেন আমার  প্রচন্ড এলার্জি। ভীষণরকম চুলকায়। আমার কাছে ভালো সবকিছুই কাঁদামাটিরগড়া শিশুর খেলনা মাত্র। যা খেলার একপর্যায়ে ভেঙে ফেলাই নিয়ম। তাই আমি ভালোমানুষিকে দেখি সুযোগের অভাবেভালো থাকার অভিনয় হিসেবে। 


আমার এইসব অস্বাভাবিক আচরণের জন্য আমার জন্মকে দায়ী ভাবতে থাকি। 

কেননা আমার জন্ম হয় আমার মায়ের মৃত্যুর দুইদিন পর। কথাটা শুনেই মনে হতে পারে নেশাগ্রস্থ বেড়ালের আপ্ত বাক্য।কিংবা কোনো ফালতু গল্পের একটা মনোযোগ আকর্ষণ করা পাঞ্চ লাইন। আরে বলে কী পড়ে দেখি এমন। আসলে ওতকিছু না ব্যাপারটা।  বা 'হাউ ইজ ইট পসিবলবলে  ভ্যাবাচেকা খাওয়ার মতো বিষয়ও না। অবশ্য আমিও প্রথম প্রথম এইঘটনা বা গল্প শোনে  অবাক হওয়ার শেষ পর্যায়ে গিয়ে বসে থাকতাম। কিংবা এমন ভাব করতাম যেন , এটা আমি ছাড়াপৃথিবীর আর কারও সাথে ঘটেনি।

ঘটনাটা খুবই সিম্পল আর সস্তা গল্প হিসেবে ইন্টারেস্টিং  


আমার মা আমাকে প্রসব করে সেন্সলেস হয়ে পড়ে। হওয়ারই কথা। আমার মায়ের বয়স তো তখন সবে ১৫। পনেরোবছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কি না আবার একটা ৯মাস পেটে রেখে অথবা বলা যায় ৯মাস বয়সী এক বাচ্চা প্রসব করেফেলেছে। জ্ঞান ফিরেও পেয়েছিলেন দ্রুতই। কিন্তু আরেক অঘটন জানতে পেরে আবার সেন্সলেস হওয়া লাগছে আমারমায়ের। ডাক্তার আমাকে ঘোষণা করেছিলেন মৃত। মা কথাটা শুনেও ফেলে ওই অবস্থায়। না শোনানোর স্কোপও ছিল না।ফিনকি দিয়ে মায়ের বুক থেকে দুধ বের হচ্ছিল। আমাকে ছাড়া সে বেদনাময় দুধ কে থামাতে পারে তখনঅথচ আমিনাকি মৃতকোনো সাড়াশব্দ নেইনড়নচড়ন নেই। যেন আমি খুব অবাক হয়ে গেছি। বিরক্ত হয়ে  মেরে চুপটি হয়েআছি। আমি নাহয় চুপ রয়েছিলাম। আমার শ্বাস প্রশ্বাস , শিরা-উপশিরাগুলো যে কেন  হয়ে ছিলসেই এক দুঃখেরইতিহাস। মায়ের কান্না মে বি শুনেও আমি চুপ রয়েছিলাম এখনকার যে খারাপ মানুষ আমি সেরকমভাবেই।  সব আশাজলাঞ্জলি দিয়ে আমার মা তখন নেয় এক সাহসী কিন্তু 'বোকাবোকাসিদ্ধান্ত। কোনোদিনও আর না জাগার সিদ্ধান্ত নেয়।ওই কাঁচা অসুস্থ শরীরে নাকি মা আমার নৃশংস আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। কীভাবে সে আত্মত্যা করেছিলেন সেটা আমিএখনো জানি না। তাও ঘটনাটা ঘটায় ৪৮ ঘণ্টা আমাকে অযথা বুকে চেপে রেখে। তারপর নাকি তিনি আমাকে ছেড়ে দেয়আর ছেড়ে দেন জীবনকেও। 

আর অলৌকিকভাবে অসভ্যের মতো একটা কান্না দিয়ে হাসপাতাল মাথায় তুলি। 


 মারা যাওয়ার আগে নাকি বারবার শুধু বলতেন আমার শুভ মরেনি ডাক্তার ভুল বলেছে। আমার নাম আমার জন্মেরআগেই মা দিয়েছিলো  অবশ্য। 

মায়ের হাত তখন বাবার হাতে শক্ত করে ধরা। বাবা তখন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল আর ভাবছিল মায়ের ভীমরতি। মা তখনবলে উঠে আমার ছেলেকে আমার কাছে নিয়ে আসো।


 ডাক্তার এবং আমার আত্মীয় স্বজন নিথর দেহের আমাকে প্রাণচঞ্চল দেখে ভীষণ অবাক হয়।

সবার ধারণা জন্মেছিল আমি মানুষ না অন্যকিছু। খুব বেশিদিন আমি টিকবো না। মিরাক্কেলভাবে যেমন আমার উদয়তেমনি মিরাক্কেলভাবে আমি অস্তমিত হবো শিগ্রই। ৪৮ ঘণ্টা পর যেহেতু আমি জেগে উঠি তাই আমি সহজ বাংলায় বলিমায়ের মৃত্যুর দুদিন পর আমার জন্ম।


আমার মায়ের আত্মাহুতির জন্য আমার দাদি মাকে সবসময় ভৎসর্না করে। বলেকপালপুড়ির দোযখেও জায়গা হবে না।

এমন ভৎসর্না শুনে আমার কষ্ট পাওয়ার কথা কিন্তু আমি কষ্ট পাই না। বরং চরম বিনোদিত হই। এর জন্য আমার কঠিনহৃদয়  দায়ী না। বরং মায়ের প্রতি অজানা ভালোবাসা থেকেই  আনন্দ পাই। দোযখে স্থান না হওয়াই তো ভালো।দোযখে শুনেছি অনেক কষ্টযদিও বুঝি কী হাস্যকর সহজ করে নিচ্ছি দাদির ভাষাকে। 

আমার মায়ের হঠাৎ  সিদ্ধান্ত দুনিয়ার কেউ মেনে না নিতে পারলেও আমি মেনে নিই অনায়াসেই। কারণ আমি মনে করিজন্ম বা মৃত্যু দুইটাই মানুষের ইচ্ছায় হওয়া উচিত। অচেনা অনিশ্চিত একটা পৃথিবীতে হঠাৎ কষ্টের জন্য কেন জন্ম নিবেমানুষ  কিংবা কেন বেঁচে থাকতে না চাইলেও মরতে পারবে না। 


আর তাছাড়া আত্মহত্যার অধিকার তার ছিলো। কেননা  ১৫ বছরের একটা কচি মেয়ে কখনো মেনে নিতে পারে না তারপ্রথম সন্তান মৃত। পারবে না লোকমুখে শুনতে সন্তানকখেকো মা।

মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু হলে মানুষের আই কীই বা থাকে। আকাশসম স্বপ্ন দেখা আমার মায়ের স্বপ্ন অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।আমার মৃত্যুর কথা শোনার মধ্য দিয়েই। মা কীভাবে জানি জেনে গেছিল তার সন্তান ছেলেই হবে। আর তাই জন্মেরআগেই ঘরভর্তি ছিল 'ছেলেদের খেলনায়  যদিও আমি কখনো ওগুলো দিয়ে খেলিনি। খেলাধুলার প্রতি বিরাগ আমারজন্মের পর থেকেই। 


কচি বয়সী মায়ের আরও নানান ছেলেমানুষি স্বপ্ন বুনেছিল। বাবাকে নাকি বলত , ছেলে যখন নির্ঘুম থাকবে তুমি আমিতিনজনেই সজাগ থাকব।  বাবা মুচকি মুচকি হাসতো মায়ের ছেলেমানুষিতে। অবাক স্বপ্নে। 

এত স্বপ্ন আর এত আদর যখন ব্যর্থ হয়ে যাই তখন বেঁচে থাকাটাই একটা মরে যাওয়া হয়ে দাঁড়ায়। তাই মায়েরআত্মহত্যাকে আমি সমর্থন করি।


সেই সাথে নিজেকে চরম দায়ী মনে করি - মায়ের মৃত্যুর জন্য। 

এনিয়ে হাজারও  যুক্তি দেখালে লাভ হবে না। যুক্তির বাইরে থেকে হোক আর যুক্তির ভেতর থেকেই হোক আমি আমারবিশ্বাসে স্থির। আই কিলড মাই মাদার। 


শুনেছি মায়ের মৃত্যুদিন আকাশে ছিল পূর্ণিমা তিথি। আর শ্রাবণের টিপটিপানি। বয়স ছিলো ১৫ বছর ১৫ দিন।আজকেও সেই একই দিনের একই বয়সে পৌঁছেছি আমি। মায়ের মৃত্যুর প্রায়শ্চিত্তের আশায় আজ আমি চিরতরে হারিয়েযাবো  গ্রহ থেকে। আমার হাতে হেমলক বিষ। শ্রাবণের মেঘলা আকাশে হবো নীলছায়া। চাঁদের জ্যোৎস্না গায়ে মেখেমায়ের হাত ধরে হাটবো বহুদূর। আর না বলা ডাকে পাগল করবো মাকে  কোনোদিনও আর কারও সাথে খারাপ ব্যবহারকরতে হবে না। পনেরো বছর পরের একদিন অথবা একটি চাঁদের অমাবস্যা 

  

আমার নাম শুভ। শুভ' আভিধানিক অর্থ ভালো। অথচ আমার ক্ষেত্রে তা শুধু অভিধানেই সীমাবদ্ধ। আমার নামেরবাস্তব প্রয়োগ আমি কোথাও দেখাতে পারি নি। আমার জীবনে কোনো ভালো কিছুর ছাপ নেই। ভালো ব্যবহারভালো বন্ধুকিছুই নেই আমার। অন্ধকারই আমার একমাত্র জীবন।  মানুষ হিসেবে ঘরকুনো হলেও যখন বের হই তখন খারাপ কাজছাড়া কিছু করি না। করতে ইচ্ছেই হয় না। নামেএ বিপরীতে যাওয়ারই প্ল্যান আমার সব সময়। রাস্তারপাশে ঘরহীনমানবেতর জীবন যাপনকারী অসহায় মানুষ থেকে শুরু করে ভার্সিটির শিক্ষক সবার সাথেই যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাই যেনআমার এই পৃথিবীতে একমাত্র কাজ। ভালো কোনোকিছুর ধার ধারি না। রিকশা ভাড়া দর কষাকষি করে ওঠার পরওতর্কাতর্কি করি ভাড়া মেটানোর সময়একপর্যায়ে ঘুষি কিংবা  গালিগালাজ করে ক্ষান্ত হই। 


ভালো যেকোনো কিছুতেই যেন আমার  প্রচন্ড এলার্জি। ভীষণরকম চুলকায়। আমার কাছে ভালো সবকিছুই কাঁদামাটিরগড়া শিশুর খেলনা মাত্র। যা খেলার একপর্যায়ে ভেঙে ফেলাই নিয়ম। তাই আমি ভালোমানুষিকে দেখি সুযোগের অভাবেভালো থাকার অভিনয় হিসেবে। 


আমার এইসব অস্বাভাবিক আচরণের জন্য আমার জন্মকে দায়ী ভাবতে থাকি। 

কেননা আমার জন্ম হয় আমার মায়ের মৃত্যুর দুইদিন পর। কথাটা শুনেই মনে হতে পারে নেশাগ্রস্থ বেড়ালের আপ্ত বাক্য।কিংবা কোনো ফালতু গল্পের একটা মনোযোগ আকর্ষণ করা পাঞ্চ লাইন। আরে বলে কী পড়ে দেখি এমন। আসলে ওতকিছু না ব্যাপারটা।  বা 'হাউ ইজ ইট পসিবলবলে  ভ্যাবাচেকা খাওয়ার মতো বিষয়ও না। অবশ্য আমিও প্রথম প্রথম এইঘটনা বা গল্প শোনে  অবাক হওয়ার শেষ পর্যায়ে গিয়ে বসে থাকতাম। কিংবা এমন ভাব করতাম যেন , এটা আমি ছাড়াপৃথিবীর আর কারও সাথে ঘটেনি।

ঘটনাটা খুবই সিম্পল আর সস্তা গল্প হিসেবে ইন্টারেস্টিং  


আমার মা আমাকে প্রসব করে সেন্সলেস হয়ে পড়ে। হওয়ারই কথা। আমার মায়ের বয়স তো তখন সবে ১৫। পনেরোবছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কি না আবার একটা ৯মাস পেটে রেখে অথবা বলা যায় ৯মাস বয়সী এক বাচ্চা প্রসব করেফেলেছে। জ্ঞান ফিরেও পেয়েছিলেন দ্রুতই। কিন্তু আরেক অঘটন জানতে পেরে আবার সেন্সলেস হওয়া লাগছে আমারমায়ের। ডাক্তার আমাকে ঘোষণা করেছিলেন মৃত। মা কথাটা শুনেও ফেলে ওই অবস্থায়। না শোনানোর স্কোপও ছিল না।ফিনকি দিয়ে মায়ের বুক থেকে দুধ বের হচ্ছিল। আমাকে ছাড়া সে বেদনাময় দুধ কে থামাতে পারে তখনঅথচ আমিনাকি মৃতকোনো সাড়াশব্দ নেইনড়নচড়ন নেই। যেন আমি খুব অবাক হয়ে গেছি। বিরক্ত হয়ে  মেরে চুপটি হয়েআছি। আমি নাহয় চুপ রয়েছিলাম। আমার শ্বাস প্রশ্বাস , শিরা-উপশিরাগুলো যে কেন  হয়ে ছিলসেই এক দুঃখেরইতিহাস। মায়ের কান্না মে বি শুনেও আমি চুপ রয়েছিলাম এখনকার যে খারাপ মানুষ আমি সেরকমভাবেই।  সব আশাজলাঞ্জলি দিয়ে আমার মা তখন নেয় এক সাহসী কিন্তু 'বোকাবোকাসিদ্ধান্ত। কোনোদিনও আর না জাগার সিদ্ধান্ত নেয়।ওই কাঁচা অসুস্থ শরীরে নাকি মা আমার নৃশংস আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। কীভাবে সে আত্মত্যা করেছিলেন সেটা আমিএখনো জানি না। তাও ঘটনাটা ঘটায় ৪৮ ঘণ্টা আমাকে অযথা বুকে চেপে রেখে। তারপর নাকি তিনি আমাকে ছেড়ে দেয়আর ছেড়ে দেন জীবনকেও। 

আর অলৌকিকভাবে অসভ্যের মতো একটা কান্না দিয়ে হাসপাতাল মাথায় তুলি। 


 মারা যাওয়ার আগে নাকি বারবার শুধু বলতেন আমার শুভ মরেনি ডাক্তার ভুল বলেছে। আমার নাম আমার জন্মেরআগেই মা দিয়েছিলো  অবশ্য। 

মায়ের হাত তখন বাবার হাতে শক্ত করে ধরা। বাবা তখন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল আর ভাবছিল মায়ের ভীমরতি। মা তখনবলে উঠে আমার ছেলেকে আমার কাছে নিয়ে আসো।


 ডাক্তার এবং আমার আত্মীয় স্বজন নিথর দেহের আমাকে প্রাণচঞ্চল দেখে ভীষণ অবাক হয়।

সবার ধারণা জন্মেছিল আমি মানুষ না অন্যকিছু। খুব বেশিদিন আমি টিকবো না। মিরাক্কেলভাবে যেমন আমার উদয়তেমনি মিরাক্কেলভাবে আমি অস্তমিত হবো শিগ্রই। ৪৮ ঘণ্টা পর যেহেতু আমি জেগে উঠি তাই আমি সহজ বাংলায় বলিমায়ের মৃত্যুর দুদিন পর আমার জন্ম।


আমার মায়ের আত্মাহুতির জন্য আমার দাদি মাকে সবসময় ভৎসর্না করে। বলেকপালপুড়ির দোযখেও জায়গা হবে না।

এমন ভৎসর্না শুনে আমার কষ্ট পাওয়ার কথা কিন্তু আমি কষ্ট পাই না। বরং চরম বিনোদিত হই। এর জন্য আমার কঠিনহৃদয়  দায়ী না। বরং মায়ের প্রতি অজানা ভালোবাসা থেকেই  আনন্দ পাই। দোযখে স্থান না হওয়াই তো ভালো।দোযখে শুনেছি অনেক কষ্টযদিও বুঝি কী হাস্যকর সহজ করে নিচ্ছি দাদির ভাষাকে। 

আমার মায়ের হঠাৎ  সিদ্ধান্ত দুনিয়ার কেউ মেনে না নিতে পারলেও আমি মেনে নিই অনায়াসেই। কারণ আমি মনে করিজন্ম বা মৃত্যু দুইটাই মানুষের ইচ্ছায় হওয়া উচিত। অচেনা অনিশ্চিত একটা পৃথিবীতে হঠাৎ কষ্টের জন্য কেন জন্ম নিবেমানুষ  কিংবা কেন বেঁচে থাকতে না চাইলেও মরতে পারবে না। 


আর তাছাড়া আত্মহত্যার অধিকার তার ছিলো। কেননা  ১৫ বছরের একটা কচি মেয়ে কখনো মেনে নিতে পারে না তারপ্রথম সন্তান মৃত। পারবে না লোকমুখে শুনতে সন্তানকখেকো মা।

মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু হলে মানুষের আই কীই বা থাকে। আকাশসম স্বপ্ন দেখা আমার মায়ের স্বপ্ন অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।আমার মৃত্যুর কথা শোনার মধ্য দিয়েই। মা কীভাবে জানি জেনে গেছিল তার সন্তান ছেলেই হবে। আর তাই জন্মেরআগেই ঘরভর্তি ছিল 'ছেলেদের খেলনায়  যদিও আমি কখনো ওগুলো দিয়ে খেলিনি। খেলাধুলার প্রতি বিরাগ আমারজন্মের পর থেকেই। 


কচি বয়সী মায়ের আরও নানান ছেলেমানুষি স্বপ্ন বুনেছিল। বাবাকে নাকি বলত , ছেলে যখন নির্ঘুম থাকবে তুমি আমিতিনজনেই সজাগ থাকব।  বাবা মুচকি মুচকি হাসতো মায়ের ছেলেমানুষিতে। অবাক স্বপ্নে। 

এত স্বপ্ন আর এত আদর যখন ব্যর্থ হয়ে যাই তখন বেঁচে থাকাটাই একটা মরে যাওয়া হয়ে দাঁড়ায়। তাই মায়েরআত্মহত্যাকে আমি সমর্থন করি।


সেই সাথে নিজেকে চরম দায়ী মনে করি - মায়ের মৃত্যুর জন্য। 

এনিয়ে হাজারও  যুক্তি দেখালে লাভ হবে না। যুক্তির বাইরে থেকে হোক আর যুক্তির ভেতর থেকেই হোক আমি আমারবিশ্বাসে স্থির। আই কিলড মাই মাদার। 


শুনেছি মায়ের মৃত্যুদিন আকাশে ছিল পূর্ণিমা তিথি। আর শ্রাবণের টিপটিপানি। বয়স ছিলো ১৫ বছর ১৫ দিন।আজকেও সেই একই দিনের একই বয়সে পৌঁছেছি আমি। মায়ের মৃত্যুর প্রায়শ্চিত্তের আশায় আজ আমি চিরতরে হারিয়েযাবো  গ্রহ থেকে। আমার হাতে হেমলক বিষ। শ্রাবণের মেঘলা আকাশে হবো নীলছায়া। চাঁদের জ্যোৎস্না গায়ে মেখেমায়ের হাত ধরে হাটবো বহুদূর। আর না বলা ডাকে পাগল করবো মাকে  কোনোদিনও আর কারও সাথে খারাপ ব্যবহারকরতে হবে না।

মেঘের দিন

 ঘুম ভাঙে জানলার কাচে বৃষ্টির ছাটের শব্দে। বৃষ্টি দেখে ঘুম আরও গাঢ় হলো। ঘুম ভেঙে জালনা খোলে বসে আছি কখন থামবে বা কমবে বৃষ্টি৷ থামার আর নাম ন...