বাংলা অ্যাকাডেমির শুকনো পুকুরপাড়ে বসে আছি। তোমাকে মনে পড়ছেপুরনো প্রেমিকাদের আড়াল করে।প্রেমিক হিশেবে আমার পরিণতি আমিঅগ্রিম ভাবতে থাকি। কারণ ভালোবাসার শেষ পরিণতি নিষ্ঠুরতা দিয়েইশেষ হতে দেখেছি সারাজীবন । তাই আমার দেখার মনের স্ক্রিনেনেতিবাচক সব দৃশ্যই ভেসে ওঠে। আমি দেখতে পাই তোমার কোমল পাদিয়ে পিষে দিয়ে যাচ্ছ আমার সর্বাঙ্গ । পাড়িয়ে মাড়িয়ে বোঝাচ্ছ রবিনাথেরসেই কথা সান্ত্বনা বাক্যের মতোই,
'মনেরে আজ কহ যে ভালোমন্দ যাহাই
আসুক সত্যরে লও সহজে।'
সারাজীবন এই প্র্যাক্টিসই তো করলাম দার্শনিক স্টয়িকও এই দীক্ষাই তো দিল সারাজীবন । তবু কেন এত ভয় হারানোরআর যাতনা কেন এত ভালোবাসায় তা না বোঝে যখন শুকনা পুকুরে জলের খোঁজে পা নামাই আর দেখতে পাই একমৎসকন্যা। ভয় পেয়ে বলি একী! শুকনা এই পুকুরে মানুষের মুখ নিয়ে এ কোন মাছ। এই তীব্র গরমে স্বপ্ন দেখবো কেনো? কিংবা মাথা এলোমেলো হবে কেনো , যেখানে কিছুক্ষণ আগেই আনারস তরমুজ আর লেবুর শরবত খেয়ে শরীরকে করেনিলাম পুরো ১০০% ফিট। আমার ইচ্ছে হল ভয়ের মুখেই মৎস্যকন্যারে বলি , আর ইউ লস্ট বেবি গার্ল? তুমি অ্যাকাডেমিরপুকুরে কেন? তুমি কি কোনো অভিশাপে ঢাকার এই জল আছে তবু নেই পুকুরে নিক্ষিপ্ত হয়েছ? আমার কিছুই বলতে হলোনা। দেখলাম মাছই আমাকে বলছে হাই হোয়াটস আপ সবুজ। চিন্তিত কেন ছোট ভাই। আমার রেগে যাওয়ার উপক্রম।আমি নাকি চিন্তিত আর সে বলছে আমি ছোট ভাই! বিরক্তি নিয়ে বললাম চিন্তিত তোমাকে নিয়ে তোমার যেখানে থাকারকথা নীলজলে সেই তুমি চলে এলে এঁদোডোবায়। এই তোমাদের জন্যেই রিপোন্দারা ফেসবুকে লেখে ,
'টিনের চালে কাক , হোয়াট দ্য ফাক অথবা শালা আমি তো অবাক'!
মনে হলো মৎস্যকন্যা রাগ করছে। মুহূর্তে না কিছু বলে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মনখারাপই হলো আমার। একদিন আগেই যেখানে মিথ্যে এক অভিযোগ আমার নামে মনে পড়ে গেল। আমি নাকিসম্পর্কের মূল্যায়ন করতে জানি না আর সময়কে ফাঁকি দিয়ে সাইকোলজিস্টের চোখকেও ফাঁকি দিয়ে ফেলি। আমার চোখেনাকি আছে এমন এক ভাব যেটা দৃশ্যত সুন্দর হলেও পুরো মিথ্যে সুন্দর।
মৎস্যকন্যাও কি তবে আমায় ভুল বুঝলো?
যাক একটু শীতল পানির খোঁজে এসেছিলাম সেদিকেই নজর দিলাম। পা ডুবালাম মৃত পুকুরের ঘোলা জলে। নিজেকে মনেহচ্ছিল মহিষ ।গরমে বিরক্ত মহিষ যে কিনা চাচ্ছে এই পুকুরে মাথাটা অল্প ভাসিয়ে ডুবে থাকতে আজীবন। উপর উপরপানি গরম থাকলেও পা টের পেল যত নিচে যাচ্ছে ততোই শীতল পানি পাচ্ছে সে। তৃষার্ত পা গপাগপ গিলছে পানি , যেকিনা ভুলে গেছে পানি পান করতে হয় খেতে নয়।
ব্যাকরণ না মানা পায়ে হঠাৎ টেনে ধরছে কেউ একজন। মৎস্যকন্যা নয়তো আবার? ভয়ে তাড়াতাড়ি পা উঠিয়ে দেখলামক্ষুধার্ত কিছু তেলাপিয়া , শিং কামড়াচ্ছে আমায়! তাদের প্রতি মায়া হলো , মন চাচ্ছিল পা টা কেটে খেতে দিয়ে যায় ওদের।পরক্ষণেই মনে পড়ল আনিকার কথা। পা হারিয়ে হাঁটব কীভাবে আনিকার হাত ধরে।
পা তুলে চলে আসবো তখনই দেখলাম আনিকা বলছে , 'তুমি কত স্বার্থপর । সব নগদ নগদ চাও। কেন মৎস্যজীবনেও তোপেতে পারো আমায়। এত সাধারণ বৈষয়িক সাধারণ জীবনে কেন চাও? '
আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। কীই বা বলার আছে এমন মহৎ কথার পর। তখন বললাম আমি আসলে বাংলা বই আরবাংলা ছবির পোকা তো সেখান থেকে শিখি , 'তুই আমার না মানে তুই কারও না' এমন জোর জবরদস্তির শিক্ষা। আমিআরও চাই না মেয়ে তুমি অন্য কারও হও, পাবে না কেউ তোমাকে তুমি কারও নও। কিন্তু একই সাথে আমি তো খুব দুর্বলতাই জোরগুলো করতে পারি না।
মৎস্যকন্যা আনিকা হেসে ডুব দিল জলে, লজ্জাবনত হাসি দিয়ে।
উঠে এলাম জল থেকে আর কথা বললাম এক কালো পিঁপড়ার সাথে। জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা তোমরা নাকি মুসলিম আরতোমাদের খেয়ে ফেললে নাকি সাঁতার পাওয়া যায় ভালো? আর একই সাথে বললাম ভয় পেয়ো না আমায়; সাঁতার পারিভালো। একদিন বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের একপাড় থেকে আরেক পাড় গিয়ে ফিরে এসেছি যদিও ফেরার সময় মাঝপথে মনেহয়েছিল দমবন্ধ হয়ে মারা যাবো। পরে কিছু টেকনিক্যাল সাঁতার দিয়ে ঢেউয়ের কাছে শরীর মেলে পার হয়ে গেছিলাম। আরভাবছিলাম গভীরজলের সাথে ভাব দেখাব না কোনোদিন । আমার কথা শুনে একরম বিরক্তি নিয়েই চলে গেল আর বলারআগে বলে গেল উইন্টার ইজ কামিং।
আমার হাসি পেল আর মনে পড়ে গেল গেম অব থ্রুনসের কথা। যেখানে সবাই সে দীর্ঘ শীত নিয়ে ভয়ে আছে। কিন্তুপিঁপড়াদের কীসের ভয়। এরা কি সাপের মতো শীত নিদ্রায় চলে যায় প্রয়োজনীয় সব খাবার নিয়ে , আমি তা জানি না, তাজানি না। কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। সবাই কেমন অবজ্ঞা করে চলে যাচ্ছে। আর বাংলা অ্যাকাডেমিতে পাহারত পুলিশেরফোনে বাজছে , তুহি মেরি ফ্যান্টাসি গান। গানের অডিয়ো শুনেই বিদ্যা বালান আর নাসিরুদ্দিন শাহর কথা মনে পড়েগেল। আবার মুচকি হেসে যখন বসতে যাচ্ছিলাম , তখন একটা পাখির ইচ্ছে হলো আমার মাথায় হাগার। হেগে তো সেপগারপাড়। কাছে এলে হয়তো জিজ্ঞেস করতাম, তুমি কি ভালোবেসে হাগলা নাকি বিরক্ত হয়ে? কোনো সিদ্ধান্ত নিজেরমতো বানাতেও পারলাম না এপাখি কি চায়?
আমি তো কাউয়ার বন্ধু এজন্য কি ইর্ষায় অন্য পাখিরা আমার ওপর বিরক্ত । নাকি ওটাই তাদের গ্রিটিংস স্টাইল।
সে যাইহোক বরাবরের মতোই আনিকাকে মনে পড়তে থাকল। এর তীব্রতা এত প্রখর হলো যে বইমেলায় আগত সবাইকেমনে হচ্ছিল আনিকা। আনিকা তাবাসসুম। সবাই আনিকার মতো হাসছে । সত্যিকারের আনিকা তবে কোনজন! ভয়েকাউকেই হাই দিতে পারছিলাম না। আমার মনে চাচ্ছিল আমিও আনিকা হয়ে যাই। সন্দেহ দূর করতে ফোন বের করে যখনসেলফি ক্যামেরা অন করলাম। দেখলাম যে আমিও আনিকা তাবাসসুম। এ কেমন ঘোরে বন্দী হয়ে গেলাম। দ্রুত বের হতেচাচ্ছিলাম সবকিছু থেকে। তাই ছবির হাটের সামনে গিয়ে খেলাম মুরগির সালুন দিয়ে ভাত। যদিও আমি সারাজীবনএইসব মুরগি খাওয়া বিরোধী। কিন্তু আমার মনে পড়ল যেই ফাঁদে পড়েছি এর থেকে বের হওয়ার একটাই উপায় হাকিমচত্ত্বরের পচা খিচুড়ি খাওয়া নয়তো ছবির হাটে মুরগির সালুনে ভাত খাওয়া। এর আগে বেশকয়েকবার এই সমস্যায়পড়েছিলাম। ২০১৭ সালের পর আবার বহুদিন পর এই সমস্যায় পড়লাম।
ভাত খাওয়ার পর একটা ম্যাঙ্গো জুস খেতেই সবকিছু স্বাভাবিক হওয়া শুরু হলো। সব আনিকা আস্তে আস্তে জরিনাকারিনা কিংবা রহিম রূপবান হতে থাকল। অপরিচিত মুখ আর একটা অপরিচিত বাতাস আমাকে জানাল সবুজ তুমিসকালেই কেন আজ আগারগাও গিয়েছিলে? তুমি কী জানো না আগারগাও কতকিছু ঘটে? নয়নতারা ফোটে না আরদেবব্রত হারিয়ে যায় ষাট ফিটের এক শেয়াল ডাকা সন্ধ্যায় অন্য এক ষাট ফিটে।
ভাত খেয়ে এখন অলস ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাতে চাচ্ছি না। ঘুমালে হয়তো আবার আগের অবস্থায় চলে যাওয়ার চান্স আছেl