Monday, December 24, 2018

ক্রিসমাস মেমোরি

২০১৪। ডিসেম্বরের ২৪ তারিখের এক দুপুরে চড়ে বসলাম ধোবাউড়ার বাসে। ময়মনসিংহ থেকে বাস ধুলা উড়িয়ে সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে নামিয়ে দিলো ধোবাউড়া বাসস্ট্যান্ডে৷
নেমে একটা হোটেলে ঢুকে পরোটা মিষ্টি আর পুরি খেলাম।

বাজারের এদিকে সেদিক দেখছিলাম। উপজাতি মেয়েদের আনাগোনায় বাজারের পরিবেশটা এক স্বর্গীয় উদ্যানে রূপ নিয়েছিল।

হঠাৎ একটু দূর চোখে পড়লো এক অষ্টাদশী উপজাতি কিশোরী মেয়ে কমলা নিয়ে বসেছে। আমার সহযাত্রী সাজিদ বলল এগুলো পাহাড়ি কমলা। ইম্পোর্ট করা না। দেশি কমলা খাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। বাতাবি লেবুর দামে পেয়ে গেলাম কমলা।  কমলার ভেতরে কোন রসকষ ছিলো না বললেই চলে।
ধোবাউড়া কেন কী উদ্দ্যেশ্যে গিয়েছি তখন পর্যন্ত আমার অজানা।
সেখান থেকে বাড়ি ফিরবো নাকি সেখানেই রাত কাটাবো সেটাও আমার মাথায় নেই। যাচ্ছি হাঁটছি গাড়িতে চড়ছি। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম। পাহাড়ের কাছে সমতলের কাছে। নিজের কাছে আর ফিরতে পারছিলাম না।
রাত হলে যে এখানে কেউ নেই, হোটেল নেই সেই ভাবনা আসছিলই না।

একসময় এক নদীর কাছাকাছি চলে গেলাম। নদীটা শান্ত তবু স্থির নয়। শোনা যায় অদ্ভুত এ নদী এই হাটু সমান পানি যেকোনো সময় গলা সমান হয়ে যেতে পারে।

আমি মুগ্ধ হচ্ছিলাম পাহাড় ঘেষা এ নদীর মধ্যে একটু অহংকার নেই। একটু বড়াই নেই। সে তার আপন মনে ছুটে চলে যাচ্ছে কোথাও।
কোথায় যাচ্ছে কেন যাচ্ছে সে নিয়ে কারও মাথা ব্যথাও নেই।
বড়দিনের আগের রাত হিসেবে এখানে একটা উৎসব উৎসব আমেজ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আদিবাসি যন্ত্রের শব্দ ভেসে আসছে ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকেই।
আমরা হেঁটে নদী পার হলাম। ভাবছিলাম কোন এক আদিবাসীর বাড়ির উৎসবে যোগ দিয়ে দিই।
আবার ভাবছিলাম আমাদের দেখে নাশকতাকারী ভেবে আমাদের তারা খুনও করে ফেলতে পারে। ভয় লাগছিল।
রাত যত বাড়তে লাগলো শীতও হুহু করে তেড়ে আসতে লাগলো। বাঙলাদেশে থেকে তারচেয়ে তীব্র শীত আর কখনও অনুভব করিনি।
রাতের সাথে সাথে ভয়ও বাড়তে লাগলো। না ফেরার রোমাঞ্চকর সিদ্ধান্ত তখন ভয়াবহ ভুল সিদ্ধান্ত মনে হতে থাকলো।
নদীর পাড়ে কাঁশবনের ভেতর ঢুকে চারদিকে কাঁশবন দিয়ে ডেকে ঘরের মতো করে শুয়ে পড়লাম।
ভাবলাম আরামে ঘুমাতে পারবো। কিন্তু  কুয়াশা য্যানো বরফ বৃষ্টি। দুচোখ বন্ধ করার কোন সুযোগ নেই। ঘণ্টাখানেক থাকার পর সে জায়গা থেকে উঠে আবার হাঁটতে থাকলাম। রাত হয়ে গেছে দুইটা।
চারদিকে ঢাকঢোলের শব্দে অস্থির পৃথিবী। কেমন অদ্ভুত ঘোরলাগা একরাত।
হাঁটতে হাঁটতে দেখা পেলাম এক মাঝবয়েসী লোকের। তিনি আমাদের দেখে উলটা দৌড় দিলেন। আমরা ভাই দাঁড়ান বলাতে থমকে দাঁড়িয়ে সাহস তবু ভয়ের সাথে এসে দাঁড়ালেন আমাদের সামনে।

আমরা জিজ্ঞেস করলাম ওইযে মাইক বাজছে যে ইসলামিক জলসার এটা কোনদিকে। সে আমাদের নদীর একটা দিক চিনিয়ে দিয়ে তার পথে হাঁটতে থাকলেন দৌড়ের মতো।
নদী পার হয়ে সাজিদ টের পেল তার টাকা পয়সা হারিয়ে গেছে। আবার ফিরে সেই রাতে টাকা খুঁজেও পেলো কাকতালীয়ভাবে।

মাইকের আওয়াজ শুনি। মনে হয় এইতো কাছেই। কিন্তু মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে সেই মাইকের সন্ধান আর পাই না।
এই অন্ধকারে নেই কোন বিদ্যুৎ নেই কোন পথ নির্দেশক। আওয়াজ ধরে ধরে অনেক পথ পেরিয়ে পাই সেই ইসলামি জলসার আসর।
৪-৫ জন মানুশ বক্তার ওয়াজ শুনে যাচ্ছে ঘুম ঢুলুঢুলু চোখ নিয়ে। কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলে সেই সভার খড় বিছানো জমিনে শুয়ে আছে। কেউ কেউ ঘুমাচ্ছে কেউ বা জেগে জেগে দুষ্টুমি করছে।
আমিও তাদের সাথে শুয়ে পড়ি ঘুমানোর জন্য। একটু চোখ লেগে আসার আগেই টের পেলাম কে যেনো পা দিয়ে আমাকে উল্টিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। "ক্যাডা এইডা ক্যাডা এইডা" করে এক মহিলা তার ছেলে রাসেলকে ডেকে নিয়ে চলে যাচ্ছে টের পেলাম।
এই এতটুক রাত য্যানো শেষ হবার নয়। বাজছিল তখন মাত্র ৩.৫০। অপেক্ষা করছিলাম অন্তত সাড়ে পাঁচটা বাজুক।
মনে হচ্ছিল আজকের রাতটা থেমে গেছে কোন কারণে আর কোনদিন সকাল হবে না। এই দুর্বিষহ ঠাণ্ডায় জমে, চোখেমুখে একঝাঁক ক্লান্তি নিয়ে অনেক বছর বয়সী এক রাত কাটাতে হবে।
তবু রাত তো থেমে থাকে না কখনও অবশেষে রাত্রি পোহাইলো।
আমরা সেখান থেকে জিলাপি খেয়ে। হাঁটতে লাগলাম ঘোষগাও বাজার লক্ষ্য করে। সেই বাজারও য্যানো হাজার ক্রোশ দূরে। মনে হচ্ছিল ৭ মহাদেশ হাঁটার পরই তবে পাবো ঘোষগাঁও বাজার। পেলাম বাজার।
পরোটা খাওয়ার পর দেখলাম। সারি সারি শয়ে শয়ে মানুষ হেঁটে হেঁটে কই জানি যাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না গির্জায় যাচ্ছে। আমরাও তাদের সাথে হেঁটেহেঁটে গির্জার পথ ধরলাম। গির্জার সামনে গেলাম। আমাদের হাবভাব দেখেই কেউ একজন বুঝে গেলো আমরা খ্রিস্টান না।
একজন এসে ধমকের মতো করে বলল এখান থেকে যান। আপনাদের প্রার্থনার সময় কী আমরা যাই।
খানিকটা অপমানবোধ নিয়ে চলে এলাম।  মেলা বসেছে গির্জার সামনেই। সেখান থেকে বেলুন কিনে নিয়ে আবার অন্যপথে হাঁটতে থাকলাম।

Saturday, September 29, 2018

অধ্যাপক

‌একজন ভূগোলবিদ কিংবা চিত্রকর যেকোনো সময় বেছে নিতে পারে ফেরিওয়ালার জীবন৷ কিন্তু একজন অধ্যাপক?  অধ্যাপকের যেনো কোথাও যাবার নেই। অধ্যাপকের চোখে একঝাঁক অন্ধকার মেধা একটু ছোঁয়া দিলেই মেধাগুলো জ্বলায় লাল নীল প্রভূত দীপাবলী।

দীপাবলীর মোহ থেকে অধ্যাপক পারে না বেরিয়ে আসতে। সেই মোহই তাঁকে আটকে রাখে স্যাঁতস্যাঁতে ৬০০ স্কয়ার ফিটের ভাড়া বাড়িতে। 

ভাত আছে মাছ নাই মাছ আছে লবণ নাই। স্পষ্ট অভাবের জাতাকলে কেটে যাচ্ছে সংসার। 

স্ত্রী চোখ রাঙানি দেখেও না দেখার ভানে চশমাটা চোখ থেকে নাকের কাছে এনে বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানে চোখ রেখে দেখে যান রাগের সমার্থক শব্দ। অভাবের সমার্থকশব্দ। আর ভাবতে থাকেন ঝগড়া বানে ঝ কেন? জ য কেন নয়? আবার ভাবতে থাকেন ব্যাকরণ্ণিক বিষয় আমার না। থাকুক বানান যেমন আছে।

বড় মেয়েটাক্লাস এইটে পড়ে। সে জানে তার বাবার পরিস্থিতি। তার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করে না। ঝালমুড়ি ফুচকা ভালো লাগে না।

কিন্তু ছোট মেয়ে! যার কিনা বয়স মাত্র ৫।  যার ভালো লাগে সবই। তাকে তো ফ্রিজে লবণ চিনি দিয়ে পানি জমিয়ে আইসক্রিমের বিকল্প বুঝানো যাবে না।

অধ্যাপক মাঝেমধ্যেই খুব করে কাঁদেন। সেই কান্না কাউকে স্পর্শ করে না। মানে সবার অগোচরে কাঁদেন৷ ভাবেন এতো এতো ছাত্রছাত্রী কেন পড়াশোনা করতে আসে। এরা এতো শিক্ষিত হয়ে যাবে কোথায়! এদের যাওয়ার জায়গা কোথায়। কেন সবাইকে অনার্স মাস্টার্স করতে হবে! এমন বিলাসিতা এরা পেলো কোথায়! কারও কি ইচ্ছে হয় না উদ্যোক্তা হবার। নাকি সবাই বেছে নিতে চায় আমার মতো মাস্টারির জীবন। 


রাগে মাথা গরম হতে থাকে।  মাথা গরম হওয়া আমার গল্পের অধ্যাপকের নিদ্রা কুসুম।  রাগ উঠলেই আর বিছানায় থাকলেই ঘুম চলে আসে।


অধ্যাপক শুয়ে আছে শশুড়বাড়ির থেকে পাওয়া একমাত্র উপহার সেগুন খাটের উপরে। 


অধ্যাপক বক হয়ে গেলেন। ডানা মেলে উড়তে থাকলেন শরতের মেঘওড়া আকাশে। টুপ করে বসলেন পুকুরের নিঃস্বঙ্গ এক  বাঁশের খুটিতে।


পুকুরের স্বচ্ছ জলে ভেসে যাচ্ছে পুটিমাছ।  পুটি মাছের প্রতি তাঁর কোন লোভ নেই। তিনি বরং তাকিয়ে দেখছেন ঝাঁকবেঁধে ছুটে চলা পুটি মাছের দল। বাতাসে নদীর ঢেউয়ের মতো পুকুরের পানির ধাক্কাকে উপেক্ষা করে পুটিমাছের সাঁতরে বেড়ানোর যে ছন্দ তা দেখে বক অধ্যাপকের হলো মানুষ হবার শখ। শুধু মানুষ না কবি মানুষ। 


কবি মানুষ হয়ে তিনি লিখতে চাচ্ছেন একটা পুটি মাছ কাব্য। 


বক, মানুষও হয়ে ওঠে তৎক্ষনাৎ।  মানুষ হওয়ার পর দেখা যায় তার হাতে বড়শি। বড়শিতে গাঁথা মাছ শিকারের লোভনীয় খাদ্য। 


তিনি ভুলে যায় বক জন্মের কাব্যিকতার কথা। 


তাঁর শুধু মনে হতে থাকে পুটি মাছের ভাজির সাথে শুকনা মরিচের কম্বিনেশন।  সাথে খিদে পেটের গরম ভাতের কথা।


বড়শিতে টপাটপ উঠতে থাকে একের পর এক করে অগণিত পুটি, সরপুটি।


রান্নাঘরে বউয়ের সাথে মাছ শিকারি অধ্যাপক পেঁয়াজ ছিলতে ছিলতে গল্প করেন, জানো আঁখির মা আজগে ছিলো মাছেগো বিয়া। সব মাছ এক অইছে বিয়ার অনুষ্ঠান করতে। এইযে দেখতাসো না পুটি মাছের কানের কাছে কেমন সোনালি লাল ভাব। এইগুলা হইলো গিয়া বিয়ার সাজ। আমি তো হাসতে হাসতে মরি। মাছেগো আবার বিয়া। আমি যেই না টুপ ফালাই ওমনি কামড়ে ধরে। ভাবছে বিয়ার ভোজ। হাহাহা!


বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে খেতে বসে যেই কড়া ভাজা মাছটা মুখে দিবে ওমনি ঘুম ভেঙে যায় অধ্যাপকের৷ 


ঘামে ভিজে গেছে অধ্যাপকের গা। কারেন্ট চলে গেছে নাকি ফ্যান নষ্ট হয়ে গেছে বুঝার আগেই ওদিকে রান্নাঘর থেকে স্ত্রীর চিৎকার ভেসে আসছে,' সারাদিন খালি ঘুম আর শুইয়া বইসা থাকা! ওদিকে যে ঘরে পেয়াজ নাই, লবণ নাই। সেই খবর কি আছে! মাইনশের সংসার করি শুধু সম্মানের ভয়ে। নইলে এখনও বাপের বাড়িতে চলে গেলে বাকি জীবন শুইয়া বইসা খাইতে পারবো। 


অধ্যাপক চুপচাপ বাজারের ব্যাগ নিয়ে হাটতে থাকে দোকানের দিকে। চোখেমুখে একটক লজ্জা দোকানে বাকি ৩ হাজার টাকা আবার নতুন করে বাকি চাইবে কীভাবে ভাবতা ভাবতে চশমা মুছতে মুছতে হেঁটে যাচ্ছেন পৃথিবীর পথ অধ্যাপক। 


মেঘের দিন

 ঘুম ভাঙে জানলার কাচে বৃষ্টির ছাটের শব্দে। বৃষ্টি দেখে ঘুম আরও গাঢ় হলো। ঘুম ভেঙে জালনা খোলে বসে আছি কখন থামবে বা কমবে বৃষ্টি৷ থামার আর নাম ন...