আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের একজনের বয়স সাড়ে ৪ বছর। তার সাথে আমার পরিচয় কলেজে।
আমি যে কলেজে যে বিভাগে পড়তাম সেখানে সাধারণত খুব সাধারণ ছেলেমেয়েরাই পড়াশোনা করে। মানে মানবিক ডিপার্টমেন্ট যারে বলে। মানে অনেকেই বলে মানবিকে গরু গাধারাই পড়ে। এনিওয়ে এটা ভুল নাকি সত্য সেই জাজমেন্টে না যেয়ে আমার বন্ধুর প্রসঙ্গে ফিরে যাই।
বন্ধুটার মধ্যে অন্যরকম আকর্ষণ আছে। অন্যরকম আকর্ষণ বলতে যেমন বুঝায়। দেখে মনে হয় কোথায় যেনো দেখেছি। কিংবা এর মতো আরেকজনের সাথে আমার আগে পরিচয় ছিল। কোথায় কবে সেটা তো আর মনে করা যায় না। তবে এমন পরিচিত লাগে মাঝেমধ্যে কাউকে কাউকে।
তো এই বন্ধুকে ভালো লাগার প্রধান কারণ দেখতে সুন্দর সেটাই হবে হয়তো। অন্য সবাই তো সবাই। গায়ের ধূলি কাদামাখা ছেলেপেলে। আমি সুন্দর না কখনওই কিন্তু আমি আমার টাইপের হাদাভোদা লোকের সাথে চলতে নারাজ। এইটা আমার বর্ণবাদী আচরণ হইতে পারে।
তো এই ছেলেটাকে যে পছন্দ হলো। কিংবা তার সাথে পরিচয় হওয়ার দরকার পড়লো সেটা বলার মত শক্তিও আমার ছিল না। কারণ আমার একটা অহম বা দুর্বলতা আছে যে আগ বাড়িয়ে আমি কারও সাথে আলাপ পাড়ি না।
কথার পরিবেশ পেলে আমার চেয়ে বাচাল আর কেউ না পরিবেশ না পেলে আমার চেয়ে প্যাচামুখো আর কেউ না।
তো কথা বলার সুযোগ পাই একটা মেয়ের দিকে চেয়ে থাকতাম সেই মেয়েটার সৌজন্যে। এত বেশি চেয়ে থাকতাম যে মেয়েটা ধরে ফেলল যে আমি তার প্রতি দূর্বল। কেমন দুর্বল সেই হয়তো মনে মনে জানতো।
আরেকটা মেয়ে আছে যেটা ছিল বার্বিডলের মতো চেহারা। সে এসে আমাদের একজন মেয়েলি স্বভাবের বন্ধুর সাথে সন্ধি করলো, "হে ছেলেরা তোমরা আমাদের সাথে কথা বলতে পারো। আমরা আমরাই তো"। মেয়েটা ক্লাসে ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হয়েছিল। খুবই শৃঙখলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তখন উঠে পড়ে লাগলো। তাঁকে দেখে আমার মনে হতো বড় হলে মেয়েটা আর্মির মেজর হবে। দুর্ভাগ্য এই যে মেয়েটা ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারেই বিয়ের পিড়িতে বসে যায়। আমরা হারাই আমাদের ক্যাপ্টেনকে হারাই একজন পুতুলকে।
তো ওইযে যে মেয়েটার দিকে তাঁকিয়ে থাকতাম সেই মেয়েটাকে আমার মনে হতে থাকলো ঝর্ণা, যখন হাসে খলখলিয়ে নেমে আসে এক পশলা পানি। মাটিতে আছড়ে পড়ে যেনো সবকিছু স্বর্ণে পরিণত করে। মেয়েটাকে মনে হতো পাখি যার চাঞ্চল্যে ভরে উঠতো ক্লাস। যেন পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হচ্ছে ক্লাস।
একদিন মেয়েটা এসে আমাকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলো। তারপর তার আরও দুয়েকজন বান্ধবী নিয়ে এসে আমার চৌদ্দ গুষ্টির খবর নিলো।
আস্তে আস্তে জানতে পারলো আমি নিয়মিত গোসল করি না। জানতে পারলো নিয়মিত ব্রাশ করি না। আর চুল আর কাপড় চোপড় দেখে তো বুঝতেই পারতো আমি কতটা হেয়ালি অথবা অবহেলিত। তারপর ওই মেয়েটার সাথে আমার কীভাবে কীভাবে যেনো দীর্ঘদিনের একটা প্রেমের সম্পর্কও ছিল। যেনোতেনো প্রেম নয়। একদম আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে প্রেম। আমি অবশ্য এই লেখাটায় প্রেমের অন্য এক গল্প বলতে এসে প্যাচিয়ে ফেলছি।
আগের দিকে ফিরে যাই। এই মেয়েটাকে আমি সেই সুদর্শন ছেলের কথা বলি। বলি ক্লাসে তাঁকে ছাড়া আর কাউকে ছেলে মনে হয় না। মেয়েটা দুষ্টুমি করে বলে ফেলল প্রপোজ কর। আরে বাল আমি কি বাই সেক্সুয়াল নাকি শাউয়া! মনে মনে এই কথা বললেও সামনাসামনি লজ্জা পেয়ে বললাম আচ্ছা করবো নে প্রপোজ। তারপর প্রপোজ বলতে সাহস করে ওই ছেলের সাথে কথা বলে বসি। জিজ্ঞেস করি কুথাই তুমার বাড়ি কি তুমার নাম! একে অপরের নাম দাম জানা হলে। সেই দুষ্টু পরবর্তীতে প্রেমিকা মেয়েটি এসে আমাকে বলে কীরে প্রপোজ৷ করছিস! আমি বলি হ! সে পরে আমার সুদর্শন বন্ধুকে বলে কী! তুমি রাজি হইসো। বন্ধু কিছু না বুঝেই বলে হ্যা হইছি। সে বলে আরে আমাকে কেউ প্রপোজ করে ফুল না দিলে জীবনেও এক্সেপ্ট করতাম না। অবশ্য পরে ওর সাথে যখন আমার প্রেম হয়েছিলো ফুল দিয়ে শুরু করার দরকার পড়ে নি।
তো আমি এসেছি আজকে মূলত বন্ধুর প্রেমের কথাটা বলতেই। পৃথিবীতে কেউ কখনও আগের প্রেমকে স্বীকার করতে চায় না। ভাবে সেটা তার প্রেম ছিলো না।
বন্ধু আমার দেখতাম টিফিন পিরিয়ডে কিংবা ক্লাস গ্যাপে কয়েকজন মেয়ে নিয়ে রেস্টুরেন্টে চলে যেতো এভ্রিডে। তখনও আমি জানতাম কেউ কেউ জাস্ট ফ্রেন্ডই হয়। নাথিং এলস। কিন্তু মানুষ মূলত এমন এক প্রাণী যে পাশাপাশি থাকলে সে প্রেমে পড়তে বাধ্য। জানা গেলো সেই বন্ধুর মেয়ের গ্রুপ থেকেই একজনকে সে ভালোবাসে। সে স্বীকার করেছে অবশ্য ছোট এক রূপসীর কথা। আমরা অবশ্য কেউ কেউ ভাবতাম সে হয়তো ভালোবাসে ওর গ্রুপের বড়সড় মেয়েটাকে।
বলবে বলবে করে বলার আগেই সে মেয়েকে পছন্দ করে বসে আমার আরেক বন্ধু। এবং প্রপোজ করে চুটিয়ে প্রেম করা শুরু করে। যে কথা কখনও কাউকে বলিনি সেটা হলো সেই মেয়েকে আমারও কিঞ্চিৎ পছন্দ হয়েছিল। ভাগ্য থাকলে তার সাথে যে প্রেম করতাম না তা নয়।
তো এদিকে আমার সুদর্শন বন্ধু ডিপ্রেশড। চোখেমুখে তার ব্যর্থ হওয়ার চরম গ্লানি। উপরে উপরে খুব ভালো থাকলেও যে তার সম্পদ হরণ করলো তাকে একরকম শত্রুই ভাবতে থাকলো।
তো প্রেম যখন শুকায়ে যায় তখন মানুষ পারফেকশন খুঁজে। এবং বুঝতে পারে একে দিয়ে আর আমার চলছে না। তখন দেখা যায় সে গরিব, খাটো, একটু কালো, মোটা, রোগা ইত্যাদি। প্রেমিক বন্ধু হঠাৎ সেই মেয়ের সাথে ব্রেকাপ করে। আর এটা নিয়ে সবাই ছিঃ ছিঃ করতে থাকে। বলে এই ছিল তার মনে। মানুষ এত খারাপ হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ কেউ তো ছড়াচ্ছিল খেয়ে ছেড়ে দিয়েছে। সেটা শুনে আমার সুদর্শন বন্ধু ভেরি আফসোস করতে থাকে। আর বলতে থাকে কুত্তার বাচ্চা মানুষের বাচ্চা না। এরকম ঠাণ্ডা শান্ত মেয়ের মন নিয়ে কেউ এমন ছিনিমিনি খেলতে পারে! আসলে সেটা বড় কথা কী না জানি না। তার তো মূলত ব্যথাটা অন্য জায়গায় যে। শালা আমাকেও দিলি না তুইও নিলি না।
আমার প্রেমিকাও বলে ছেলেটা ভুল করলো। মেয়েটা খুবই ভালো ছিলো। সাধারণত আমাদের সমাজে ভালো মেয়ে যাদেরকে বলে। মানে সংসারি স্বামীর কথা শুনবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
ইতোমধ্যে আমার সেই সুদর্শন বন্ধু পছন্দ করে বসেছে ক্লাসের আরেক মেয়েকে৷ তাঁকে সে কীভাবে কি প্রপোজ করেছে আমার জানা নেই। তবে আমরা জানতাম সে রিজেক্ট হয়েছে। তাকে রিজেক্ট করছে বলে আমাদের অনেকে মেয়েটার প্রতি রাগ। রাগে কেউ কেউ বলতো কী ঢং আর লুতুপুতু।
তো মেয়েটা চালাক ছিল আমার মনে হয়। যতদিন কলেজ ছিলো ততদিন হয়তো গা বাঁচিয়ে বাঁচতে চেয়েই কিংবা ভালো মেয়ে সাজতে চেয়েই কলেজ জীবনে প্রেমটা করতে চায় নি।
কলেজ শেষ শেষ পর্যায়ে ফেসবুক একাউন্ট খুলে আর সব মেয়ের মতো আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। আমার খোঁজ খবর নেয়। তারপর ইনিয়েবিনিয়ে বুঝাতে চায় এটা সম্ভব না। কোনটা সম্ভব না সেই কথা যদিও আমি কখনও বলিনি। তবে আমার সুপারিশ না তবে কথা ছিলো যে ছেলেটা ভালো। তোমার ইচ্ছে থাকলে দেখতে পারো। আমি কারও পার্সোনাল বিষয়ে নাক গলাবো না কিংবা চাপাচাপি করবো না। মানুষের সিদ্ধান্ত মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত।
এই গা বাঁচিয়ে কথার পরও আমার বন্ধুর তার ধারণা আমি তার প্রেমে সহযোগিতা করেছি। আর আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে নাকি সেই প্রেম করতে চাইতো। কিংবা তার দোষ গাইয়ে আর নিজের সুনাম গেয়ে নিজের করে নেয়ার চেষ্টা করতো। হাহা আমি জানি না কী আসলে। তবে আমি জানি মানুষের সাইকোলজি অদ্ভুত। কী কীভাবে কোথায় কেন কেউ জানে না।
তবে শেষ কথা হল আমার অত গভীর প্রেম টিকে নাই। আমার অনেক শরীর খোঁজা বন্ধুরও কলেজে দুইটা প্রেম একই ক্লাসে আরও অন্য ডিপার্টমেন্টে ফ্লার্টিং টার্টিং করে শেষমেশ তার বাড়ির পাশের এক মেয়েকে ভাগিয়ে বিয়ে করে একটা বাচ্চা পয়দা করে সুখে শান্তিতে কিংবা অন্যভাবে টিকে আছে।
আর যেই বন্ধুর কথা শেষে বললাম সে বন্ধুর প্রেম হয়ে যায় পাকাপোক্ত ভাবে ইন্টারমিডিয়েটের পর। তারপর সে এবরোডে চলে যায়। আর ওখান থেকেই তাদের দুই ফ্যামিলিকে ম্যানেজ করে আকদ করে রেখেছে। ইদের পর এবরোড থেকে এসে বিয়ে করবে তারা।
আমার প্রেম টিকে নাই। আরও অনেকের প্রেম টিকে নাই। যারা ভেবেছিল মরে যাবে তারা এখন কেউ কেউ নতুন প্রেমে মজে আছে। আবার কেউ কেউ বিয়ে করে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে।