Saturday, September 29, 2018

অধ্যাপক

‌একজন ভূগোলবিদ কিংবা চিত্রকর যেকোনো সময় বেছে নিতে পারে ফেরিওয়ালার জীবন৷ কিন্তু একজন অধ্যাপক?  অধ্যাপকের যেনো কোথাও যাবার নেই। অধ্যাপকের চোখে একঝাঁক অন্ধকার মেধা একটু ছোঁয়া দিলেই মেধাগুলো জ্বলায় লাল নীল প্রভূত দীপাবলী।

দীপাবলীর মোহ থেকে অধ্যাপক পারে না বেরিয়ে আসতে। সেই মোহই তাঁকে আটকে রাখে স্যাঁতস্যাঁতে ৬০০ স্কয়ার ফিটের ভাড়া বাড়িতে। 

ভাত আছে মাছ নাই মাছ আছে লবণ নাই। স্পষ্ট অভাবের জাতাকলে কেটে যাচ্ছে সংসার। 

স্ত্রী চোখ রাঙানি দেখেও না দেখার ভানে চশমাটা চোখ থেকে নাকের কাছে এনে বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানে চোখ রেখে দেখে যান রাগের সমার্থক শব্দ। অভাবের সমার্থকশব্দ। আর ভাবতে থাকেন ঝগড়া বানে ঝ কেন? জ য কেন নয়? আবার ভাবতে থাকেন ব্যাকরণ্ণিক বিষয় আমার না। থাকুক বানান যেমন আছে।

বড় মেয়েটাক্লাস এইটে পড়ে। সে জানে তার বাবার পরিস্থিতি। তার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করে না। ঝালমুড়ি ফুচকা ভালো লাগে না।

কিন্তু ছোট মেয়ে! যার কিনা বয়স মাত্র ৫।  যার ভালো লাগে সবই। তাকে তো ফ্রিজে লবণ চিনি দিয়ে পানি জমিয়ে আইসক্রিমের বিকল্প বুঝানো যাবে না।

অধ্যাপক মাঝেমধ্যেই খুব করে কাঁদেন। সেই কান্না কাউকে স্পর্শ করে না। মানে সবার অগোচরে কাঁদেন৷ ভাবেন এতো এতো ছাত্রছাত্রী কেন পড়াশোনা করতে আসে। এরা এতো শিক্ষিত হয়ে যাবে কোথায়! এদের যাওয়ার জায়গা কোথায়। কেন সবাইকে অনার্স মাস্টার্স করতে হবে! এমন বিলাসিতা এরা পেলো কোথায়! কারও কি ইচ্ছে হয় না উদ্যোক্তা হবার। নাকি সবাই বেছে নিতে চায় আমার মতো মাস্টারির জীবন। 


রাগে মাথা গরম হতে থাকে।  মাথা গরম হওয়া আমার গল্পের অধ্যাপকের নিদ্রা কুসুম।  রাগ উঠলেই আর বিছানায় থাকলেই ঘুম চলে আসে।


অধ্যাপক শুয়ে আছে শশুড়বাড়ির থেকে পাওয়া একমাত্র উপহার সেগুন খাটের উপরে। 


অধ্যাপক বক হয়ে গেলেন। ডানা মেলে উড়তে থাকলেন শরতের মেঘওড়া আকাশে। টুপ করে বসলেন পুকুরের নিঃস্বঙ্গ এক  বাঁশের খুটিতে।


পুকুরের স্বচ্ছ জলে ভেসে যাচ্ছে পুটিমাছ।  পুটি মাছের প্রতি তাঁর কোন লোভ নেই। তিনি বরং তাকিয়ে দেখছেন ঝাঁকবেঁধে ছুটে চলা পুটি মাছের দল। বাতাসে নদীর ঢেউয়ের মতো পুকুরের পানির ধাক্কাকে উপেক্ষা করে পুটিমাছের সাঁতরে বেড়ানোর যে ছন্দ তা দেখে বক অধ্যাপকের হলো মানুষ হবার শখ। শুধু মানুষ না কবি মানুষ। 


কবি মানুষ হয়ে তিনি লিখতে চাচ্ছেন একটা পুটি মাছ কাব্য। 


বক, মানুষও হয়ে ওঠে তৎক্ষনাৎ।  মানুষ হওয়ার পর দেখা যায় তার হাতে বড়শি। বড়শিতে গাঁথা মাছ শিকারের লোভনীয় খাদ্য। 


তিনি ভুলে যায় বক জন্মের কাব্যিকতার কথা। 


তাঁর শুধু মনে হতে থাকে পুটি মাছের ভাজির সাথে শুকনা মরিচের কম্বিনেশন।  সাথে খিদে পেটের গরম ভাতের কথা।


বড়শিতে টপাটপ উঠতে থাকে একের পর এক করে অগণিত পুটি, সরপুটি।


রান্নাঘরে বউয়ের সাথে মাছ শিকারি অধ্যাপক পেঁয়াজ ছিলতে ছিলতে গল্প করেন, জানো আঁখির মা আজগে ছিলো মাছেগো বিয়া। সব মাছ এক অইছে বিয়ার অনুষ্ঠান করতে। এইযে দেখতাসো না পুটি মাছের কানের কাছে কেমন সোনালি লাল ভাব। এইগুলা হইলো গিয়া বিয়ার সাজ। আমি তো হাসতে হাসতে মরি। মাছেগো আবার বিয়া। আমি যেই না টুপ ফালাই ওমনি কামড়ে ধরে। ভাবছে বিয়ার ভোজ। হাহাহা!


বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে খেতে বসে যেই কড়া ভাজা মাছটা মুখে দিবে ওমনি ঘুম ভেঙে যায় অধ্যাপকের৷ 


ঘামে ভিজে গেছে অধ্যাপকের গা। কারেন্ট চলে গেছে নাকি ফ্যান নষ্ট হয়ে গেছে বুঝার আগেই ওদিকে রান্নাঘর থেকে স্ত্রীর চিৎকার ভেসে আসছে,' সারাদিন খালি ঘুম আর শুইয়া বইসা থাকা! ওদিকে যে ঘরে পেয়াজ নাই, লবণ নাই। সেই খবর কি আছে! মাইনশের সংসার করি শুধু সম্মানের ভয়ে। নইলে এখনও বাপের বাড়িতে চলে গেলে বাকি জীবন শুইয়া বইসা খাইতে পারবো। 


অধ্যাপক চুপচাপ বাজারের ব্যাগ নিয়ে হাটতে থাকে দোকানের দিকে। চোখেমুখে একটক লজ্জা দোকানে বাকি ৩ হাজার টাকা আবার নতুন করে বাকি চাইবে কীভাবে ভাবতা ভাবতে চশমা মুছতে মুছতে হেঁটে যাচ্ছেন পৃথিবীর পথ অধ্যাপক। 


No comments:

Post a Comment

মেঘের দিন

 ঘুম ভাঙে জানলার কাচে বৃষ্টির ছাটের শব্দে। বৃষ্টি দেখে ঘুম আরও গাঢ় হলো। ঘুম ভেঙে জালনা খোলে বসে আছি কখন থামবে বা কমবে বৃষ্টি৷ থামার আর নাম ন...